সুন্নাহর আলোকে সাহু সিজদা

ছালাতে ভুলক্রমে কোন ‘ওয়াজিব’ তরক হয়ে গেলে শেষ বৈঠকের শেষে সালাম ফিরানোর পূর্বে ‘সিজদায়ে সহো’ দিতে হয়। রাক‘আতের গণনায় ভুল হ’লে বা সন্দেহ হ’লে বা কম বেশী হয়ে গেলে বা ১ম বৈঠকে না বসে দাঁড়িয়ে গেলে ইত্যাদি কারণে এবং মুক্তাদীগণের মাধ্যমে ভুল সংশোধিত হ’লে ‘সিজদায়ে সহো’ আবশ্যক হয়। শাওকানী বলেন, ওয়াজিব তরক হ’লে ‘সিজদায়ে সহো’ ওয়াজিব হবে এবং সুন্নাত তরক হ’লে ‘সিজদায়ে সহো’ সুন্নাত হবে।[1] অতএব ছালাতে ক্বিরাআত ভুল হ’লে বা সের্রী ছালাতে ভুলবশত ক্বিরাআত জোরে বা তার বিপরীত হয়ে গেলে সহো সিজদার প্রয়োজন নেই।
নিয়ম : (১) যদি ইমাম ছালাতরত অবস্থায় নিজের ভুল সম্পর্কে নিশ্চিত হন কিংবা সরবে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার মাধ্যমে লোকমা দিয়ে মুক্তাদীগণ ভুল ধরিয়ে দেন, তবে তিনি শেষ বৈঠকের শেষে সালামের আগে তাকবীর দিয়ে পরপর দু’টি ‘সিজদায়ে সহো’ দিবেন। অতঃপর সালাম ফিরাবেন।[2]
(২) যদি রাক‘আত বেশী পড়ে সালাম ফিরিয়ে দেন, অতঃপর ভুল ধরা পড়ে, তখন (পূর্বের ন্যায় বসে) তাকবীর দিয়ে ‘সিজদায়ে সহো’ করে সালাম ফিরাবেন। [3]
(৩) যদি রাক‘আত কম করে সালাম ফিরিয়ে দেন। তখন তাকবীর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাকী ছালাত আদায় করবেন ও সালাম ফিরাবেন। অতঃপর (তাকবীর সহ) দু’টি ‘সিজদায়ে সহো’ দিয়ে পুনরায় সালাম ফিরাবেন।[4]
(৪) ছালাতের কমবেশী যাই-ই হৌক সালামের আগে বা পরে দু’টি ‘সিজদায়ে সহো’ দিবেন।[5]
মোট কথা ‘সিজদায়ে সহো’ সালামের পূর্বে ও পরে দু’ভাবেই জায়েয আছে। কিন্তু তাশাহহুদ শেষে কেবল ডাইনে একটি সালাম দিয়ে দু’টি ‘সিজদায়ে সহো’ করে পুনরায় তাশাহ্হুদ ও দরূদ পড়ে দু’দিকে সালাম ফিরানোর প্রচলিত প্রথার কোন ভিত্তি আমরা পাচ্ছি না।[6] সিজদায়ে সহো-র পরে ‘তাশাহ্হুদ’ পড়ার বিষয়ে ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) হ’তে যে হাদীছটি এসেছে, সেটি ‘যঈফ’।[7] তাছাড়া একই রাবী কর্তৃক বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমের ছহীহ হাদীছের বিরোধী। কেননা সেখানে তাশাহ্হুদের কথা নেই।[8]
ইমামের ভুল হ’লে পুরুষ মুক্তাদী সরবে ‘সুবহা-নাল্লা-হ’ বলে এবং মহিলা মুক্তাদী হাতের পিঠে হাত মেরে শব্দ করে ‘লোকমা’ দিবে (কুরতুবী)। [9] অর্থাৎ ভুল স্মরণ করিয়ে দিবে। এখানে নারী ও পুরুষের লোকমা দানের পৃথক পদ্ধতির কারণ হ’ল এই যে, নারীর কণ্ঠস্বরটাও লজ্জার অন্তর্ভুক্ত (لِأَنَّ صَوْتَهُنَّ عَوْرَةٌ)। যা প্রকাশ পেলে পুরুষের মধ্যে ফিৎনার সৃষ্টি হ’তে পারে। বস্ত্তত: একারণেই নারীদের উচ্চকণ্ঠে আযান দিতে নিষেধ করা হয়েছে।[10] রাসুল সাল্লাল্লাহুয়ালাইহিওয়াসসাল্লাম বলেন, " তিন রাকাত পড়লে নাকি চার রাকাত পড়লে- সালাতের মধ্যে তোমাদের এরূপ কারো সন্দেহ হলে, সে যেন সন্দেহকে দূর করে নেয় এবং সে যে কয় রাকাত পড়েছে বলে নিশ্চিত হবে ( মোটামুটি নিশ্চিত হবে, সাধারনত কম হয়েছে ধরে নেবে অর্থাত ৩ বা ৪ এ সন্দেহ হলে ৩ ধরবে আর ৪ বা ৫ এ সন্দেহ হলে ৪ ধরবে আর সাহু সাজদা করবে ) সেই কয় রাকাত কে ভিত্তি ধরে অবশিষ্ট করণীয় করবে ( অর্থাত বাকীটুকু সম্পন্ন করবে )। এরপর সালাম ফিরানোর পূর্বে দু'টো সাজদা করবে।[11] এছাড়া বুখারী ( ১/৬৯পৃ: হা: ৪৬০ ) সহ অন্যান্য কিতাবে রেফারেন্স পাবেন। মিশকাতের প্রথম খন্ডে একটা সতন্ত্র অধ্যায়ই আছে সাহু সাজদার উপর। আরও দলিল : মুসলিম ১/২১৩পৃ: হা: ৮৯৫; ৩৮৯; ৫৭২; ৫৭৩; ৫৭০; ৫৭৪★ ৫৭১ ও মুয়াত্তা মালিক, বুখারী ১২৩২; ৪০১; ৪৮২; ৮২৯ আবু দাউদ ১০৩৬; ইবন মাযাহ ১২০৮; ইরওয়াউল গালীল ৪০৮; মুসনাদ আহমাদ ১৬৪৯; মুসনাদ ইবন বাযযার ৯৯৭- এই হাদীসের বর্ননা কারী ইসমাঈল দুর্বল হলেও এর স্বপক্ষে 'শাহিদ' বর্ননাকারী থাকায় এই হাদীসটি 'হাসান'। আর এই হাদীসানুযায়ী ৩ রাকাত না ৪ রাকাত সন্দেহ হলে কম অর্থাত ৩ রাকাত ধরে নেওয়ার বিষয়ে তাকীদ রয়েছে। এই সকল দলীল মিশকাতের 'সাহু সাজদা' অধ্যায়ের থেকে গৃহীত যা তাহক্বিক করেছেন আলবানি রহ., আর আমিও যোগ করেছি। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
[1] . শাওকানী, আস-সায়লুল জাররা-র (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, তাবি) ১/২৭৪ পৃঃ।
[2] . মুসলিম, মিশকাত হা/১০১৫; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১০১৮ ‘সহো’ অনুচ্ছেদ-২০।
[3] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১০১৬ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘সহো’ অনুচ্ছেদ-২০।
[4] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১০১৭ ; মুসলিম, মিশকাত হা/১০২১।
[5] . মুসলিম হা/১২৮৭ (৫৭২), ‘সহো’ অনুচ্ছেদ-১৯; নায়লুল আওত্বার ৩/৪১১ পৃঃ।
[6] . মির‘আতুল মাফাতীহ ২/৩২-৩৩ পৃঃ ; ঐ, ৩/৪০৭, হা/১০২৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য। এই বিষয়টি ড. মোঃ রুহুল আমিনও তার ' কুরান-হাদীসের আলোকে সালাত : পদ্ধতি ও প্রভাব ' কিতাবে স্বীকার করেছেন পৃষ্ঠা ৩২৪ এ। তিনি লিখেছেন ঐ কিতাবে, " আমাদের দেশে ডান দিকে একবার সালাম ফিরানোর পর সাহউ সাজদা করার যে নিয়ম প্রচলিত রয়েছে তার স্বপক্ষে আমি কোন হাদীস পাইনি। " পৃষ্ঠা ৩২৪। উল্লেখ্য যে, এই লেখক ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গিরের অধীনে ২০০৪ সালে ' হাদীসের আলোকে সালাত : পদ্ধতি ও প্রভাব ' শিরনামে এম, ফিল ডিগ্রী অর্জন করেন যার ফলস্রুতি এই কিতাব, আর কিতাবের সুপারিশ স্বয়ং আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির নিজেই করেছেন- কিতাবটির শুরুতে।
[7] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, ইরওয়াউল গালীল হা/৪০৩, ২/১২৮-২৯ পৃঃ। আর তিরমিজি হাদীসটিকে হাসান-গরীব বলেছেন।
[8] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১০১৭ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘সহো’ অনুচ্ছেদ-২০।
[9] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৯৮৮ ‘ছালাতে সিদ্ধ ও অসিদ্ধ কর্ম সমূহ’ অনুচ্ছেদ-১৯; মির‘আত ৩/৩৫৭।
[10] . মির‘আত ৩/৩৫৭-৫৮; اَلْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১০৯ ‘বিবাহ’ অধ্যায়-১৩; فَلاَ تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ… আহযাব ৩৩/৩২।
[11]. মুসলিম ১/২১০পৃ: হা: নং: ৮৮৮; আবু দাউদ, ১/১৬৭পৃ: হা: নং: ৮৬৬

Comments

Popular posts from this blog

This Week’s Top Stories About Travel

আল্লাহ্‌ তার বান্দাকে যেভাবে হেফাজত করেন...